শনিবার, ৪ মে, ২০১৩

অসাম্প্রদায়িক চরমপন্থা


দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত ক্ষুদ্র দেশ বাংলাদেশ। ভৌগলিকভাবে যার অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বে ইন্দোনেশিয়া আর পাকিস্তানের পর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে এই দেশে। ১৫০ মিলিয়ন লোকের মধ্যে ৮৫% জন্মসূত্রে মুসলিম। যদিও এখন এই দেশে ধীরে ধীরে ইসলাম আর মুসলিমরা যেনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে চলেছে।

যদিও পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যালঘু আর মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও ধর্ম পালনে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না; অথচ এই অধিকার কেড়ে নেয়াই যেনো বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর অতি তৎপরতার সাথে এই দেশকে অসাম্প্রদায়িক/ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিতি দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। খুবই শক্তিশালী নিরীক্ষা আর উপাত্ত থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান সরকার দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করার সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আর এই কর্মপরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ভূ-খন্ড থেকে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে ইসলামের বিস্তারকে রোধ করা। ন্যুনতম ধর্মীয় স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি এমন কর্মপরিকল্পনা- যা আগ্রাসী এবং ভয়ংকর। তথাপি যদিও দেশে গণতান্ত্রিক শাসণব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু দিনে দিনে গণতান্ত্রিক নীতিমালা, আইনপ্রণয়ন, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং বহুদলীয় রাজনীতি; প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোরতর নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। যা তাদের নিজেদের মানদন্ডেই যা অসারতা আর অচলাতয়নের সৃষ্টি করবে।

এবার সরকারের শাসণামলে সংঘটিত কিছু ইসলামবিদ্বেষী কর্মকান্ড তুলে ধরতে চাই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
  • সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা বাদ দেয়া ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপন,
  • কুরআন-সুন্নাহবিরোধী নারীনীতি প্রণয়ন
  • ইসলামবিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতি চালু,
  • বোরকাবিরোধী রায় ও পরিপত্র জারি,
  • সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ইসলামবিরোধী বক্তব্য,
  • আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম নিয়ে বিভিন্ন মহলের কটূক্তি,
  • আলিমদের উপর নির্যাতন,
  • দাড়ি-টুপি ও বোরকাধারীদের হয়রানি,
  • ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড,
  • জিহাদি বইয়ের নামে অপপ্রচার,
  • ইসলামী রাজনীতি দমন ও মাদরাসাবিরোধী ষড়যন্ত্র,
  • চট্টগ্রামে নার্সিং ইনস্টিউটে হিজাব পড়তে বাধা দেয়া এবং নামাজ কক্ষে প্রবেশ করে দম্ভোক্তি,
  • ছাত্রীসংস্থার হিজাব পরিহিতা মুসলিমাহদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন,
  • চট্টগ্রামের কাতালশাহ্ মাসজিদে পুলিশের জুতা পায়ে প্রবেশ এবং নামাজরত মুসল্লিকে গ্রেপ্তার করা,
  • সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় মাজারপূজা,
  • মসজিদের সামনে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়ন,
  •  সরকারী জামে মসজিদের খতিব পরিবর্তন,
  • কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা,
  • টুঙ্গিপাড়া আর ধানমন্ডি স্কুলের শিক্ষকদের রাসুলুল্লাহকে নিয়ে ব্যঙ্গোক্তি,
  •  ইসলামিক ফাউন্ডেশান থেকে মিথ্যাচার ও দ্বীনবিকৃতিমূলক বইয়ের প্রকাশণা,
  • ইসলাম শিক্ষা বইয়ের নাম পরিবর্তন,
  • উপজাতি মুসলিমদের খ্রিস্টান মিশনারীর হাতে তুলে দেয়া,
  • ছাত্রলীগের কুরআন নিক্ষেপ করে ফেলে দেয়াসহ আরো অসংখ্য দ্বীনবিরোধী কার্যকলাপ।

ইসলামবিরোধী উক্তি:


  • কুত্সিত চেহারা ঢাকতেই মেয়েরা বোরখা পড়ে । -ডেপুটি স্পিকার শওকত ।
  • বঙ্গবন্ধু মদ জুয়া হারাম করেছিলেন । -নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান ।
  • গ্রামে গন্জে ইসলামিক জালসা বন্ধ করতে হবে । -পঙ্কজ কুমার
  • মেয়েদেরকে বোরকার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে তাদেরকে নাচ গানের শিক্ষা দিতে হবে । -হাছান মাহমুদ
  • সেনাবাহিনী থেকে ইসলামপন্থীদেরকে বিতাড়িত করতে হবে । -জয় ।
  • রাসুল সাঃ হিন্দুদের পূজার জন্য মসজিদের অর্ধেক জায়গা ছেড়ে দিয়েছে । -ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ।
  • জোর করে মেয়েদের বোরখা পরানো যাবে না । -হাইকোর্ট
  • আমি মুসলমান ও নই,হিন্দু ও নই । -সৈয়দ আশরাফ ।
  • মা দুর্গা গজে চরে এসেছে বলে ফলন ভাল হয়েছে । -শেখ হাসিনা
  • সংবিধান থেকে ধর্মের কালো ছায়া মুছে ফেলা হবে। - সাজেদা চৌধুরী
  •  ধর্ম তামাক ও মদের মতো একটি নেশা। - পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী
  • ‘কওমী মাদরাসাগুলো এখন জঙ্গিদের প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কওমী মাদরাসাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। এসব কওমী মাদরাসায় যে শিক্ষা দেয়া হয়, তা কূপমণ্ডূকতার সৃষ্টি করছে। ’৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সংশোধনী এনে ’৭২-এর সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে নস্যাত্ করার ফলেই এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর ধর্মের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়েছে।’- আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ

  • ‘পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রয়েছে, তার সবই ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে (!)। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়।’ -শামীম মোহাম্মদ আফজাল


এছাড়াও ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ অব্যাহত ছিলো আর এই ধারাকে শক্তিশালী করতে নতুন নতুন টিভি চ্যানেল খোলা হয়েছে। অতি সম্প্রতি, কালের কন্ঠ আর প্রথম আলোতে পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে ভ্রান্ত কাদিয়ানীদের বিজ্ঞাপন একটি উদাহরণ। আর, ইন্টারনেটজুড়ে বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী ব্লগ আর সাইটে এই ধারা অব্যাহত ছিলো। বিশেষ করে ধর্মকারী, নাগরিক ব্লগ, সামহ্যোয়ার ইন ব্লগসহ অসংখ্য ইসলামবিদ্বেষী ব্লগ আর সাইটের উত্থান হয়েছে এই সরকারেরই পৃষ্ঠপোষকতায়; যারা অশ্লীল, অশ্রাব্য, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছে ইসলামকে নিয়ে।


আর এই সরকার তাদের তৎপরতাকে পরিচয় করিয়ে দিতে চায় ধর্মীয় মৌলবাদের উৎখাত হিসেবে; অথচ ধর্মীয় মৌলবাদ নির্মূলের নামে তারা যে কর্মসূচী তাই বরং অনেক বেশী উগ্র আর আগ্রাসী। আর এ ভয়ংকর ধর্মনিরপেক্ষবাদ অর্জনের প্রচেষ্টা- যা ৯/১১ পরবর্তী বিশ্বে রাজনীতি আর সমাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বিস্তারকে রোধ করার আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ারই অংশ।যা এক কথায় অসাম্প্রদায়িক চরমপন্থা [radical secularism/ secular extremism]। আর এই প্রচেষ্টা কখনো ভাল ফল বয়ে আনবে না; এই দেশের অধিকাংশ জনগণের জন্য। আর এর বিরুদ্ধচারিতা আর আন্দোলনও দানা বেধে উঠছে। আর এই সরকারের অধিকাংশ কর্মসূচীই বিধ্বংসী; যাতে নেই অধিকাংশ জনগণের চিন্তার প্রতিফলন। আর যার নেই কোন যুক্তিযুক্ত ধারাবাহিকতা।

আর সরকারের মধ্যে যে অতিমাত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষবাদের বীজ রয়েছে তা সংখ্যার বিচারে নিতান্তই কম অথচ যার প্রভাববলয় অনেক বেশী। আর এই অল্প প্রভাবশালীরাই এই সকল কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। যা প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মিথ্যা প্রচারণার মাধ্যমে জিইয়ে রাখা হচ্ছে।  আর এই সকল কর্মসূচী জনবিচ্ছিন্ন, সমর্থনহীন যার জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা আর ন্যায়নিষ্ঠতা খুব দ্রুতই মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য; আর তা বুমেরাং হবে ঐ সকল নীতিনির্ধারকদের জন্য। আর বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন এমন আত্মবিধ্বংসী নীতিমালা চেপে দেয়াকে স্বভাবতঃই বরদাশত করবে না; আর এখানকার দ্বীনদার মুসলিমরা তো নয়ই।

কুরআনের কিছু উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করতে চাই:

"আর যখন তাদেরকে বলা হয় দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করোনা, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করছি। মনে রেখো, (বস্তুতঃ) তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করেনা।"[সূরা বাকারাহ্: ১১-১২]

আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? [সুরা তওবাহ:৬৫]

“নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।“ [সূরা আলে-ইমরান: ১৯]

“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্ত।“[সূরা আলে-ইমরান: ৮৫]


"হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের ক্ষতি-সাধনে কোন ত্রুটি করে না; তোমরা কষ্টে থাক, তাতই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসুত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্য নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও। দেখ! তোমরাই তাদের ভালবাস, কিন্তু তারা তোমাদের প্রতি মোটেও সদভাব পোষণ করে না। আর তোমরা সমস্ত কিতাবেই বিশ্বাস কর। অথচ তারা যখন তোমাদের সাথে এসে মিশে, বলে, আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে তারা যখন পৃথক হয়ে যায়, তখন তোমাদের উপর রোষবশতঃ আঙ্গুল কামড়াতে থাকে। বলুন, তোমরা আক্রোশে মরতে থাক। আর আল্লাহ মনের কথা ভালই জানেন।" [সূরা আলে-ইমরান: ১১৮-১১৯]


"এবং কাফেররা চক্রান্ত করেছে আর আল্লাহ্ ও কৌশল অবলম্বন করেছেন। বস্তুতঃ আল্লাহ হচ্ছেন সর্বোত্তম কুশলী।" [সূরা আলে-ইমরান: ৫৪]

“তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহ্’র আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ্ তার আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।“ [সুরা সাফফ্: ৮]

by Sayyid Mahmud Gaznabi

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন